শৈশবের গল্প এবং মুক্তা ভাই

বর্ষাকাল। আমরা তখন গাড়াদহ গ্রামে থাকি, নতুন বাড়িতে। আমি তখন খুব ছোট, ছোট ওয়ানে পড়ি সম্ভবত। আমার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড় এক ফুপাতো ভাই ছিলেন, নাম মুক্তা। তিনি তখন ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়েন। আমি এবং চাচাতো ভাই জুয়েল তার ভীষণ রকমের ভক্ত ছিলাম। তিনি নতুন কিছু কিনলেই সেটা আমাদের দেখাতেন এবং গল্প করতেন। একবার মুক্তা ভাই জিজ্ঞাসা করলেন, বলতো এক কলমে কয় শীষ? আমি বললাম এক কলমে এক শীষ। তিনি তখন বললেন এক কলমে দুই শিষ দেখেছিস কখনো? এক কলম দিয়ে দুই রঙের লেখা যায়, লাল এবং নীল। এই রকম কলম আমরা আগে কখনো দেখিনি, তাই বিষয়টা আমাদের অজানা ছিলো। আমি আর জুয়েল একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, তাই কখনো হয় নাকি? আমাদের তিনি অবাক করে দিয়ে তার পকেট থেকে একটা কলম বের করলেন, যেটাতে দুই রঙের কালি ছিলো। তিনি আমাদের হাতে দাগ টেনে এক কলমে যে দুই রঙের লেখা যায় তার প্রমাণ দিলেন। তখন ইকোনো বলপেনের ব্যাপক প্রচলন ছিলো, মুক্তা ভাই দুইটা বলপেন বের করে বললেন, দুই কলম জোড়া লাগাতে পারবি? যমজ কলম বানাতে পারবি? ছোট মাথায় তখন অত কিছু খেলতো না। তাই বললাম সেটা কি করে সম্ভব? জুয়েল বলল কলম কখনো যমজ হয় নাকি? এরপর মুক্তা ভাই কলম দুটো হাতের মুঠোয় নিয়ে একটা কাঠে আঘাত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে কলম দুটো একত্রিত হয়ে গেলো, আপাতত দৃষ্টিতে মনে হলো কলম দুটি জোড়া লেগে গেছে। আমি আর জুয়েল হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলাম এবং অবাক হলাম। মুক্তা ভাইয়ের এইরূপ কর্মকান্ডে, মুক্তা ভাইকে ম্যাকগাইভার মনে হতো। এরপর বললেন, তোরা কখনো চুইংগাম খেয়েছিস? চুইংগামের নাম আমি আগে কখনো শুনিনি। তাই বললাম, নাতো, সেটা আবার কী জিনিস? তিনি পকেট থেকে ছোট্ট একটা প্যাকেট বের করলেন, সেখান থেকে রাঙতায় জড়ানো কিছু একটা বের করে চিবাতে লাগলেন। এর কিছুক্ষণ পর তিনি সেটাকে মুখ থেকে বের করে আঙুল দিয়ে টেনে রাবারের মত লম্বা করলেন। আমরা তো সেটা দেখেই অবাক। তিনি আরো বললেন, চুইংগাম সারা দিন চিবোলেও কখনোই শেষ হয় না। বলেই তিনি আমাদের দুজনকে দুটো চুইংগাম দিলেন। রাস্তায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে আমরা চুইংগাম চিবোচ্ছিলাম। বাড়ির আঙিনায় রাস্তার দুইধারে তখন অথৈই পানি। তিনি আমাদের বর্ষার পানি দেখিয়ে বললেন, জানিস ইউরোপ আমেরিকাতে কিন্তু এখন বর্ষার পানি নাই। কারণ আমাদের এখানে যখন রাত হয় ওদের ওখানে তখন দিন, আর ওদের ওখানে যখন রাত হয় তখন আমাদের এখানে দিন। এই কথাটা শোনার পর আমি চিন্তায় পরে গেলাম, আমি ইউরোপ আমেরিকার নাম আগে কখনো শুনি নাই তাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আসলো ওগুলো কোথায় অবস্থিত, তাই জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, ইউরোপ আমেরিকা আসলে কোথায়? ওখানেও কি মানুষ থাকে? উনি জুয়েলদের কাঠের দোতলা ঘরটা দেখিয়ে বলল, মনে কর আমরা পৃথীবীর যে অংশে আছে সেটা হলো ঐ ঘরের উপর তলা, আর ইউরোপ আমেরিকা হলো ঐ ঘরের নীচতলায়। ওখানেও মানুষ থাকে। আমি বললাম সেটা কীভাবে? তিনি, ইঁদুরের একটা গর্ত দেখিয়ে বললেন, ইঁদুর যেমন এক জায়গা থেকে গর্ত খুঁরতে খুঁরতে অন্য জায়গা দিয়ে বের হয় তেমনি, আমরা এখন যেখানে দাড়িয়ে আছি, তুই যদি এখানে খুঁরতে থাকিস, তাহলে তুই খুঁরতে খুঁরতে এক সময় ইউরোপ আমেরিকায় গিয়ে বের হবি। আমি বিস্ময়ে বললাম, তাই নাকি ভাই! তাহলে আমাদের এখানে যে বর্ষার পানি, এই পানি কি চুয়ায়া চুয়ায়া ইউরোপ আমেরিকার আকাশ থেকে পরে? মুক্তা ভাই বললেন, চুয়ায়ই তো, আর ইউরোপ আমেরিকার মানুষ মনে করে বৃষ্টি হচ্ছে। তবে কি জানিস এই মাটির স্তর অনেক পুরু। আমার তখনও কৌতুহল, তাই জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা ভাই, আমরা যদি এখন এখানে লাফাই, তাহলে নীচতলায় ঐ ইউরোপ আমেরিকায় ভূমিকম্প হবে? মুক্তা ভাই বললেন, হবেই তো মনে হয়, চল আমরা লাফাই। এরপর আমরা মাটিতে লাফাতে লাগলাম।

কোন কোন গল্প সংক্ষিপ্ত হয়, হঠাৎ করেই ইতি টানতে হয়।
আমার এই গল্পের ন্যায় মুক্তা ভাইয়ের জীবনের গল্পও সংক্ষিপ্ত ছিলো।
 আজ আমার এক নিকট আত্মীয়া জানালেন, মুক্তা ভাই মারা গেছেন, তিনি আমাদের মাঝে আর নেই।

আমরা সকলেই পৃথিবীতে একটি নিদৃষ্ট সময়ের জন্য এসেছি।
আমরা সকলেই একদিন চলে যাবো। তবে সকলেই কোন না কেন গল্প রেখে যাবো প্রিয়জনদের হৃদয়ে।
আরিফুর রহমান
দ্রবাক, নরওয়ে

Comments

Popular posts from this blog

The story of a Bengali

ফেসবুক ভেরিফাইড একাউন্ট

17 awesome quotes that help me to stay motivated